ভারত ভ্রমণকারী বিদেশী পর্যটকদের তালিকায় আবারো শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশীরা। ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশটিতে যাওয়া মোট বিদেশী পর্যটকের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ গেছেন বাংলাদেশ থেকে। গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত একই চিত্র ছিল। তবে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশীদের জন্য ভারতীয় ভিসা সীমিত হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শীর্ষ পাঁচ দেশের পর্যটকের তালিকা থেকে ছিটকে পড়ে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবেশী দেশটিতে আবারো বাংলাদেশী পর্যটক বাড়তে শুরু করেছে।
ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বিদেশী পর্যটকদের তালিকায় গত এপ্রিলে শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে আবার ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশ। ওই মাসে ভারতে যান প্রায় ২৯ হাজার বাংলাদেশী। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশীদের ভিসা দেয়ার হার বাড়ানো হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ভিসা ইস্যু হচ্ছে দেড়-দুই হাজার।
ভিসা কেন্দ্রগুলোর তথ্যমতে, বাংলাদেশীদের জন্য ১৪ ধরনের ভিসা দেয় ভারত। সেগুলো হলো বিজনেস, কনফারেন্স, ডিপ্লোমেটিক, এমপ্লয়মেন্ট, ইমার্জেন্সি, এন্ট্রি, জার্নালিস্ট, মেডিকেল, মিশনারিজ, রি-ইন্টার, রিসার্চ, স্টুডেন্ট, ট্যুরিস্ট ও ট্রানজিট ভিসা। ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ট্যুরিস্ট ছাড়া বাংলাদেশীদের সব ধরনের ভিসাই দেয়া হচ্ছে।
ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত এপ্রিলে দেশটিতে ৬ লাখ ২৬ হাজার বিদেশী ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ ভ্রমণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। এরপর যথাক্রমে রয়েছেন যুক্তরাজ্য (১৩ দশমিক ৫ শতাংশ), অস্ট্রেলিয়া (৬ দশমিক ১ শতাংশ), কানাডা (৪ দশমিক ৮ শতাংশ) ও বাংলাদেশের (৪ দশমিক ৬ শতাংশ) নাগরিক।
এদিকে ভারতে ভ্রমণে যাওয়া বিদেশী পর্যটকদের একটি বড় অংশই আবার ভারতীয় বংশোদ্ভূত। দেশটির পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত এপ্রিলে ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকদের ২৯ দশমিক ৫ শতাংশই ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত। হিসাবটি আমলে নিলে দেখা যাবে, ওই সময়ে ভারতে ভ্রমণ করা প্রকৃত বিদেশীদের মধ্যে বাংলাদেশীদের হার আরো বাড়বে।
বর্তমানে ভারতে যেসব বাংলাদেশী যাচ্ছেন, তাদের সিংহভাগই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ সম্পর্কে ট্রাভেল এজেন্সির সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) মহাসচিব আফসিয়া জান্নাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভারত বর্তমানে মেডিকেল ভিসাই বেশি চালু রেখেছে। এর বাইরে খুবই সীমিত পরিসরে বিজনেস ভিসা দেয়া হচ্ছে।’ ট্যুরিস্ট ভিসা চালু না হওয়া পর্যন্ত ভারতে বাংলাদেশী পর্যটকের সংখ্যা গত বছরের আগস্টের আগের অবস্থায় যাবে না বলে মনে করেন তিনি।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) হিসাব অনুযায়ী, পর্যটন, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর আনুমানিক ৪০ লাখ মানুষ বিদেশ ভ্রমণ করেন। এর অর্ধেকের গন্তব্য থাকে প্রতিবেশী ভারত। অন্যদিকে ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে দেশটিতে ৯৫ লাখের বেশি বিদেশী পর্যটক ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশীর সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ২০ হাজার, যা ওই বছর দেশটিতে যাওয়া বিদেশী পর্যটকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
এ ধারা ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে চারটি ভারতীয় ভিসা কেন্দ্র ভাংচুর ও একটিতে মব সৃষ্টি করে আতঙ্ক ছড়ানো হয়। এর পর থেকে বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা সীমিত করে দেয় দেশটি। বন্ধ করে দেয়া হয় ট্যুরিস্ট ভিসা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত পাঁচটি ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে দেড়-দুই হাজার ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে। শুধু ভ্রমণ বা ট্যুরিস্ট ক্যাটাগরির ভিসা ছাড়া অন্য সব ধরনের ভিসাই দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জরুরি মেডিকেল, ব্যবসা, শিক্ষা ও ডাবল এন্ট্রি ভিসা। বিশেষ করে চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজনে ভিসার আবেদনগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, আগে বাংলাদেশে বছরে ১৬ লাখের মতো ভিসা ইস্যু করা হতো। দিনে গড়ে ইস্যু করা হতো ছয়-সাত হাজারের মতো ভিসা। এখন ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ থাকায় সে সংখ্যা কমে এসেছে। আগে ট্যুরিস্ট ভিসার বাইরে অন্যান্য ক্যাটাগরিতে দেড়-দুই হাজার ভিসা ইস্যু করা হতো বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ভ্রমণে যাওয়া বাংলাদেশীর সংখ্যা বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেলেও এখনো পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি বলে মনে করছেন দেশের বেসরকারি আকাশ পরিবহন সংস্থা ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম। বর্তমানে ভারতের কলকাতা ও চেন্নাইয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস বাংলা। ট্যুরিস্ট ভিসা চালু না হলে ভারতে বাংলাদেশীদের যাতায়াত বাড়বে না জানিয়ে কামরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা-কলকাতা রুটে আগে আমরা সপ্তাহে ১৪টি ফ্লাইট পরিচালনা করতাম। ঢাকা-চেন্নাই রুটে সপ্তাহে ১১টি ফ্লাইট ছিল। দুটি রুটেই এখন সপ্তাহে তিনটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে। যাত্রী না থাকায় ফ্লাইটের সংখ্যা কমাতে বাধ্য হয়েছি। সাম্প্রতিক সময়েও এ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।’